জিএম শাহনেওয়াজ ঢাকা থেকে \ সংসদের নির্বাচিত এমপি নয়, আগামীতে ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি। টানা দুইবার একটি দল ক্ষমতায় এলেও এক ব্যক্তি পর পর দুইবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তাকে পরবর্তী কোন সংসদে নির্বাচনে তার দলকে সংসদ গঠনের মতো ভোট পেতে হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেক্ষমতার ভারসাম্য আনতে এমন স্পর্শকাতর সুপারিশ করতে পারে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে এমপিদের দলের বিপক্ষে যাওয়ার কারণে পদ হারানোর যে শঙ্কা ছিল, সেখানে কথা বলার সুযোগ রাখতে গঠনমূলক সংস্কারের সুপারিশ থাকছে। এমনকি সার্বভৌম সংসদে সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের একক ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার সুপারিশ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। ডেপুটি স্পিকার থাকবেন সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ভিন্ন দলের। বাড়তে পারে ক্ষমতা। আগামী ১৫ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত খসড়া চূড়ান্ত করে ই—মেইল ও নথি আকারে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।খবর নির্ভরযোগ্য সূত্রের। সূত্র জানায়িছে, সংসদে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদেও এমপিদের মতামত দেয়ার বিধান যুক্ত কেও সুপারিশ করছে কমিশন। শুধুমাত্র এমপিরা সংসদ গঠন এবং সংসদ ভাঙার ক্ষেত্রে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন না। কিন্তু বিলের উপরে স্বাধীনভাবে মতামত, বিতর্ক ও বিল পাসের ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বাস্তবতার নিরীক্ষে কথা বলতে পারবেন। এমপিদের স্বাধীন মত প্রকাশের জায়গা থেকে গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটিশ পালামেন্টর আদলে বাংলাদেশে ও থাকবে আগামীতে সংসদ থাকবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। নির্বাহী বিভাগ চাইলে তাদের পছন্দনুযায়ী বিল সংসদে উত্থাপন করে পাস করতে পারবেন না। নিম্নকক্ষের উত্থাপিত বিল জনস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে উচ্চকক্ষের সম্মতি ছাড়া সেটা পাস করা যাবে না। এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করা, একক নেতার আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা হ্রাস করা এবং ভবিষৎ বিকল্প নেতা তৈরির জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় থাকছে সুপারিশ। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দল জনভোটের ম্যান্ডেড নিয়ে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করলে দলীয় প্রধান পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রী হলে, তাকে ছাড়তে হবে দলীয় প্রধানের পদ। প্রধানমন্ত্রীকালিন সময়ে সংশি¬ষ্ট দলের প্রধান থাকবেন ওই দলের শীর্ষ কোনো নেতা। একজন ব্যক্তি সর্বোচচ দুইবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। কিন্তু টানা দুইবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হেতে পারবেন না। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। বর্তমানে যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করেন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় তাদের পছন্দীয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীতি করেন। ক্ষমতাসীন দলের পছন্দীয় একক ব্যক্তির মনোনয়ন দেয়ার কারণে এ পদের জন্য তফসিল ঘোষণা হলেও ভোট হওয়ার নজির কম। গত কয়েক সংসদে এই প্রচলন উঠে গেছে। তাই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মনোনীতি করার সুপারিশ করতে যাচ্ছে। সেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে দল—নিরপেক্ষ ব্যক্তি হবেন রাষ্ট্রপতি এ ধরণের বাস্তবসম্মত সুপারিশ করার জন্য খসড়া প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে সার্বভৌম সংসদের একক ক্ষমতা ভোগ করেন স্পিকার। স্পিকার যদি চান তাহলে সংসদ পরিচালনায় ডেপুটি স্পিকার সংসদ পরিচালনার সুযোগ পান। আগামীতে সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের একক ক্ষমতা হ্রাস করার সুপারিশ করা হতে পারে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার ক্ষমতাসীন দলের বাইরে রাখারও সুপারিশ করা হতে পারে এমন আভাস দিয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সঙ্গে কাজ করা একাধিক ব্যক্তি। অনলাইন জরিপে সাড়ে ৫৪ হাজার মতামত : এদিকে, রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যক্তির মতামত গ্রহণের জন্য জরিপ চালিয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এর বাইরে রাষ্ট্রের ১২০ জন সুশীল সমাজের নাগরিকের মতামত নিয়েছে কমিশন বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। অনলাইন জরিপে সাড়ে ৫৪ হাজার মতামত দিয়েছেন দেশের ও দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিসিএস) মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করেছে সংস্কার কমিশন। এর মধ্যে ৪ হাজার মতামত পেয়েছে পিডিএস সংবলিত। জাতির পিতাসহ কয়েকটি ইস্যুতে শতাধিক দেশের সংবিধান পর্যালোচনাও করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এছাড়া রাজনৈতিক দলের মতামতও নিয়েছে কমিশন। নথির তথ্য পর্যালোচনা ও কমিটি সংশি¬ষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা যায, সংবিধান সংশোধন করে জাতির পিতার স্বীকৃতি ও জাতির পিতার পরিবারের জন্য ভবিষৎ সুরক্ষার সংশোধনী সন্নিবেশ করা হয়েছিল, সে সংক্রান্ত অনুচ্ছেদটি বাদ দেয়ার সুপারিশ করার জন্য খসড়া চূড়ান্ত করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। প্রসঙ্গত, — গত বছরের ৬ অক্টোবর অধ্যাপক আলী রীয়াজকে প্রধান করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।