সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:১৫ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
অসংক্রামক ব্যাধির বিস্তারে বাড়ছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও গণভোট নয়, শুধু সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে ইইউ মিশন মিয়ানমার সীমান্তের গোলাগুলিতে টেকনাফে শিশু নিহত, আরেক শিশু গুলিবিদ্ধ সিলেট থেকেই শুরু হচ্ছে তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে সমস্যা দেখছি না ইইউ পর্যবেক্ষক দলকে প্রধান উপদেষ্টা জামায়াত আমিরের সঙ্গে নাহিদ ইসলামের বৈঠক মোছাব্বির হত্যা ব্যবসাকেন্দ্রীক হতে পারে: ডিবি জামায়াত আমিরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্টেট সেক্রেটারির সাক্ষাৎ নির্বাচনের পর মার্চের শেষে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা আপিল শুনানির দ্বিতীয় দিনে বৈধতা পেলেন ৫৮ প্রার্থী, নামঞ্জুর ৭

অসংক্রামক ব্যাধির বিস্তারে বাড়ছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও

দৃষ্টিপাত ডেস্ক :
  • আপডেট সময় সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬

এফএনএস : বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ নীরবে বাড়ছে, আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও সামাজিক সংকট। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাগুলো এখন আর শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়- এগুলো একটি অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংকটের রূপ নিয়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের বিস্তার যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বীমা কাঠামোর অনুপস্থিতি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই অসংক্রামক রোগজনিত। এর মধ্যে হৃদরোগে ৩০ শতাংশ, ক্যান্সারে ১২ শতাংশ, শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৭ শতাংশ এবং ডায়াবেটিসে ৩ শতাংশ মানুষ মারা যায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই রোগগুলোতে আক্রান্তদের বড় অংশ ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী, অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। ফলে শুধু স্বাস্থ্য নয়, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ছে। এই ব্যাধিগুলোর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিদিন ইনসুলিন, গ্লুকোমিটার, রক্ত পরীক্ষা, খাদ্যনিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের ফি মিলিয়ে মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ১৫–২০ হাজার টাকা। ক্যান্সার রোগীদের জন্য কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, অপারেশন এবং ওষুধের খরচ মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি হতে পারে। হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা, ওষুধ, স্টেন্ট বা বাইপাস সার্জারির খরচ লাখ টাকার ঘরে। এসব ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার জমি বিক্রি করছে, ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ওষুধ এবং প্রশিক্ষিত জনবল ঘাটতির কারণে রোগীরা বাধ্য হন বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালে যেতে। সেখানে চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষদের পক্ষে তা বহন করা প্রায় অসম্ভব। স্বাস্থ্যবীমা কাঠামো না থাকায় চিকিৎসার পুরো ব্যয়ই রোগী বা তার পরিবারকে বহন করতে হয়। ফলে একটি পরিবারের একজন সদস্যের অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া মানে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। অসংক্রামক রোগের বিস্তারের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম, ধূমপান, মদ্যপান, অনিয়ন্ত্রিত ওজন এবং মানসিক চাপ। শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কর্মজীবী মানুষদের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণ এবং ব্যায়ামের অভাব এই রোগগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। সরকার ২০১৬ সালে ‘ন্যাশনাল এনসিডি কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজি’ চালু করলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে তা খুব বেশি অগ্রগতি পায়নি। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দের বড় অংশ এখনো সংক্রামক রোগ, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যে কেন্দ্রীভূত। অসংক্রামক রোগের জন্য আলাদা বরাদ্দ, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি কর্নার চালু করা হয়েছে, যেখানে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ শনাক্ত ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে এসব কর্নারে পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, চিকিৎসা খরচ কমাতে এবং রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে হলে স্বাস্থ্যবীমা কাঠামো চালু করা জরুরি। বাংলাদেশে এখনো স্বাস্থ্যবীমা ব্যাপকভাবে চালু হয়নি। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা সীমিত এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কার্যকর নয়। ফলে চিকিৎসার পুরো ব্যয়ই রোগী বা তার পরিবারকে বহন করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবীমা ছাড়া অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব নয়। এদিকে, অসংক্রামক রোগের বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, এটি একটি নীতিগত সংকটও। সরকারিভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেমন- জনসচেতনতা, খাদ্যনিয়ন্ত্রণ, ধূমপানবিরোধী প্রচারণা, ব্যায়াম উৎসাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা- এসব কার্যক্রম এখনো পর্যাপ্ত নয়। স্কুল, কর্মস্থল এবং গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে, খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি ও লবণের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমাতে হলে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। প্রথমত, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যবীমা কাঠামো চালু করে নিম্নআয়ের মানুষদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে। চতুর্থত, জনসচেতনতা বাড়িয়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তা ইস্যু। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যহানি, পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়- সব মিলিয়ে এটি একটি নীরব দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং তার অর্থনৈতিক অভিঘাত আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার, স্বাস্থ্যখাত, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে- নইলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ একটি অসুস্থ ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর দেশ হয়ে উঠতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2013-2022 dainikdristipat.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com